১৬ লাখ আবেদনকারী স্মার্টকার্ডের অপেক্ষায়
ড্রাইভিং লাইসেন্স সেবা কার্যক্রমে ভোগান্তি চরমে
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
০২-০৮-২০২৬ ১২:২১:১৯ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০২-০৮-২০২৬ ১২:২১:১৯ অপরাহ্ন
ফাইল ছবি
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ড্রাইভিং লাইসেন্স সেবা কার্যক্রমে ভোগান্তি এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত আট বছরেরও বেশি সময় ধরে পরিবহন খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত লাখ লাখ পেশাদার চালক স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স কার্ডের অপেক্ষায় রয়েছেন। একই সংকটে রয়েছেন বিপুলসংখ্যক অপেশাদার চালকও।
বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৬ লাখের বেশি আবেদনকারী স্মার্টকার্ডের অপেক্ষায় আছেন। প্রতিদিন নতুন আবেদন যুক্ত হওয়ায় চলতি বছরেই এই সংখ্যা প্রায় ১৭ লাখে পৌঁছাতে পারে। ফলে দীর্ঘসূত্রতা, সেবা সংকট এবং প্রশাসনিক অচলাবস্থার কারণে দেশের ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিআরটিএর একাধিক আঞ্চলিক কার্যালয়ের ড্রাইভিং লাইসেন্স শাখার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১১ সালে সংস্থাটি ইলেকট্রনিক চিপযুক্ত স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স চালু করে। শুরুতে দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান টাইগার আইটি এ কাজের দায়িত্বে ছিল। পরে প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিকভাবে কালো তালিকাভুক্ত হওয়ায় ভারতের মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স প্রাইভেট লিমিটেডকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু আট বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি আর স্মার্টকার্ড দিতে পারছে না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আগের ঠিকাদারের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই গ্রাহকের তথ্য, অব্যবহৃত স্মার্টকার্ড এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত কার্যক্রম নতুন ঠিকাদারের কাছে হস্তান্তরের পাশাপাশি নতুন ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সময়মতো দরপত্র আহ্বান এবং নতুন ভেন্ডর নিয়োগ না হওয়ায় স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স কার্ড সরবরাহে এ সংকট তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, আগের ঠিকাদারের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা গেলে বর্তমান সংকট এড়ানো সম্ভব ছিল। কিন্তু সময়মতো দরপত্র আহ্বান না হওয়ায় স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স কার্ড সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়।
টেন্ডার-সংশ্লিষ্ট নথি ও বিআরটিএ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট বিআরটিএ ওপেন টেন্ডারি মেথডে জাতীয় প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করে। প্রায় ৫০টি টেন্ডার ডকুমেন্ট বিক্রি হলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়।
গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর বিআরটিএ একটি কোরিয়েন্ডাম জারি করে কারিগরি স্পেসিফিকেশন ও যোগ্যতার শর্ত সংশোধন করে। এতে পলিকার্বোনেট ও লেজার এনগ্রেভিং প্রযুক্তি, নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের উৎপাদিত কার্ড ও পার্সোনালাইজেশন যন্ত্রপাতির শর্ত এবং সরবরাহকারীর অভিজ্ঞতার শর্ত পরিবর্তন করা হয়। সংশোধনীতে এসব পরিবর্তনকে মূল সংশোধন হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এরপর পুনঃদরপত্র আহ্বান করলে ১৫টি টেন্ডার ডকুমেন্ট বিক্রি হয় এবং পাঁচটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এবারও কোনো প্রতিষ্ঠানকে কাজ না দিয়ে বিআরটিএ তৃতীয় দফায় জাতীয় প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করে। এ দফায় গত ২০ বছরে ১০০ কোটি টাকার একটি অনুরূপ প্রকল্প সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা এবং ৪০ কোটি টাকার কার্যকরী মূলধন বা ঋণসুবিধার শর্ত বাদ দেওয়া হয়। তবে ভিসাকার্ড উৎপাদন ও আইসি এমবেডিং, মাস্টারকার্ড উৎপাদন ও আইসি এমবেডিং, মাস্টারকার্ড কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট, আইএসও ৯০০১:২০১৫ ও আইএসও ১৪০০১:২০১৫ সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়।
আর্থিক শর্ত শিথিল হলেও কার্ড প্রস্তুতকারকের জন্য আন্তর্জাতিক সনদ বাধ্যতামূলক করায় দরপত্রের যোগ্যতার মানদণ্ডে নতুন ধরনের পরিবর্তন আসে। এই পরিবর্তন মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ও প্রতিযোগিতার পরিধি নিয়েও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
টেন্ডারে অংশ নেওয়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দাবি, কারিগরি স্পেসিফিকেশন ও অভিজ্ঞতার শর্তে আনা পরিবর্তনের ফলে অংশগ্রহণের সুযোগ আরও সীমিত হয়েছে। তাদের ভাষ্য, একাধিকবার দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াকে নিয়মতান্ত্রিক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে এ বিষয়ে প্রশ্ন উঠলেও তা মোকাবিলা করা সহজ হয়।
বিআরটিএর বারবার দরপত্র আহ্বান এবং টেন্ডারে কারসাজির অভিযোগ নাকচ করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান বলেন, স্মার্টকার্ড সংকট নিরসনে বর্তমানে তৃতীয় দফার টেন্ডার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে আনুমানিক দুই মাস সময় লাগতে পারে।
আগের ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, কোনো ঠিকাদার চুক্তির শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে তাকে কালো তালিকাভুক্ত করার বিধান রয়েছে। এ প্রক্রিয়া বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো ঠিকাদারের বিরুদ্ধে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্য দেননি।
দীর্ঘ মেয়াদে সংকট নিরসনে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাংলাদেশ রোড সেফটি প্রজেক্ট (বিআরএসপি)-এর আওতায় বিআরটিএর ডিজিটাল সেবা ব্যবস্থা আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় সংস্থাটির বিভিন্ন ডাটাবেজ একীভূত করা, সমন্বিত তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো গড়ে তোলা, অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তথ্য বিনিময়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের কার্যক্রম চলছে।
তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নাধীন থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ আবেদনকারীদের হাতে কবে স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স কার্ড পৌঁছাবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি জানাতে পারেনি বিআরটিএ।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আনিসুর রহমান বলেন, সরকার একটি সমন্বিত সরকারি কার্ড (ওয়ান-কার্ড) ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে, যেখানে বিভিন্ন সরকারি সেবা এক প্ল্যাটফর্মে আনা হবে।
অতিরিক্ত সচিব আরও জানান, যেহেতু ই-ড্রাইভিং লাইসেন্স ইতোমধ্যে কার্যকর রয়েছে, তাই ভবিষ্যতে প্রিন্টিং খরচ ও কার্ড ডেলিভারি ফি বহাল থাকবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্তের সম্ভাবনা রয়েছে।
বিআরটিএর লাইসেন্স শাখার তথ্য অনুযায়ী, পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ২ হাজার ৮৩২ টাকা এবং অপেশাদার লাইসেন্সের জন্য ৪ হাজার ৫৫৭ টাকা ফি নেওয়া হয়। মেয়াদোত্তীর্ণের ১৫ দিনের মধ্যে নবায়নের ক্ষেত্রে পেশাদার লাইসেন্সের জন্য ২ হাজার ৪৮৭ টাকা এবং অপেশাদার লাইসেন্সের জন্য ৪ হাজার ২১২ টাকা পরিশোধ করতে হয়। প্রতিলিপি লাইসেন্সের ফি ৮৭৫ টাকা। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে আবেদন করলে এসব ফির সঙ্গে বিলম্ব ফিও যুক্ত হয়।
বিআরটিএর লাইসেন্স শাখার উপপরিচালক (প্রকৌশলী-২) মো. ইব্রাহিম খলিল জানান, এখন পর্যন্ত সংস্থাটি প্রায় ৭০ লাখ গ্রাহককে বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়েছে। এর মধ্যে ১৬ লাখের বেশি আবেদনকারী এখনো স্মার্টকার্ডের অপেক্ষায় রয়েছেন।
বর্তমানে বিআরটিএর অনলাইন ব্যবস্থায় নতুন পেশাদার ও অপেশাদার লাইসেন্স ইস্যু, নবায়ন, প্রতিলিপি, ঠিকানা পরিবর্তন, তথ্য সংশোধন এবং শ্রেণি পরিবর্তনসহ বিভিন্ন সেবা চালু রয়েছে। প্রায় সব সেবার ক্ষেত্রেই আবেদনকারীদের কাছ থেকে ডাকযোগে স্মার্টকার্ড পাঠানোর জন্য নির্ধারিত ৬০ টাকা এবং কার্ড প্রিন্ট বাবদ প্রায় ৬০০ টাকা আদায় করা হয়।
মো. সোবহান খান পেশায় একজন প্রাইভেটকার চালক। গত সোমবার বিআরটিএর প্রধান কার্যালয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্মার্টকার্ড নবায়নের আবেদন করেছি। এখন জুলাই ২০২৬। এর পরও কার্ড হাতে পাইনি। এর মধ্যে দুইবার নবায়ন ফি, কার্ড প্রিন্ট ও ডাকযোগে সরবরাহের চার্জ পরিশোধ করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিদেশে ড্রাইভিং ভিসায় চাকরি পেয়েও স্মার্টকার্ড না থাকায় আমার ভিসা বাতিল হয়েছে। কার্ডের আশায় প্রতি তিন মাস পরপর বিআরটিএ কার্যালয়ে খোঁজ নিতে আসি। প্রতিবারই লাইসেন্সে নতুন করে মেয়াদ বৃদ্ধির সিল দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন কর্মকর্তারা।’ একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হোসাইন সাজ্জাদ ও রেজা। দাতা সংস্থার এসইআইপি প্রকল্পের অর্থায়নে ২০২২ সালে বিআরটিএর অধীনে প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেন। তাদের অভিযোগ, চার বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো স্মার্টকার্ড হাতে পাননি। সূত্র: কালবেলা
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এনআইএন
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স